Hajj Booklet
হজ্জের ধারাবাহিক নিয়ম সমূহ
আল-কোরআনের বানী:
”মানুষের মধ্যে যাদের সেখানে (বায়তুল্লাহ শরীফে) যাওয়ার সামর্থ আছে, আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের উদ্দেশ্যে এই গৃহের হজ্জ করা তাদের অবশ্য কর্তব্য।” (আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)
আল-হাদীসের বানী:
”যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হজ্জ পালন করল এবং হজ্জ পালনকালে স্ত্রী সম্ভোগ ও গুনাহের কাজ করল না, সে বাড়ী প্রত্যাবর্তনকালে এমন নিষ্পাপ হয়ে ফিরল, যেন অদ্য সে মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হলো। ” ............(বুখারী শরীফ)
”হজরত আবু সাইদ খদরী (রা:) হতে বর্ণিত আছে যে, হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নছীহত করে বলেছেন যে, নি:সন্দেহে মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর হজ্জকে ফরজ করেছেন সেহেতু তোমরা হজ্জ কর। ”
............. (মুসলিম শরীফ)
হাজীদের জন্য ৪ টি পুরস্কার
১. গুনাহ্ মাফ:
হজরত আবু হোরায়রা (রা:) বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ করল এবং ঐ হজ্জের জন্য খাহেশাত সম্বলিত অশ্লীল কাজথেকে বিরত থাকল সে হজ্জ থেকে এমন নিষ্পাপ হয়ে ফিরল যে, সে আজই তার মতৃগর্ভ শোক আগমন করল।
২. জান্নাতের সু-সংবাদ:
হজরত আবু হোরায়রা (রা:) বলেন, রাসূরে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এক ওমরা থেকে আর এক ওমরার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য কাফ্ফারা স্বরূপ। আর হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই হইতে পারে না।
৩. দারিদ্রতা দূর হওয়া:
হজরত ইবনে মাসউদ (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূরে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হজ্জ ও ওমরাহ গুনাহ সমূহকে ধ্বংশ করে দেয় এবং দারিদ্র মিটিয়ে দেয়। আগুনের কুন্ডলি যেমন স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহার ময়লাকে দূর করে দেয়।
৪. নিষ্পাপ হওয়া:
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, চারশত পরিবারের জন্য হাজীদের সুপারিশ কবুল করা হয় অথবা ইহা বলিয়াছেন যে, নিজ পরিবারের চারশত লোকের বিষয় তাহাদের সুপারিশ কবুল করা হয় এবং হাজী সাহেবান যেই দিন জন্মগ্রহণ করিয়াছেন সেই দিনের মত নিষ্পাপ হইয়া যায়।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ১৩ বছরের মক্কা জীবনে এবং ১০ বছরের মাদানী জীবনে অক্লান্ত পরীশ্রমের পর প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবীদের কে দায়ী ইলাল্লাহ বানিয়েছিলেন। আরাফাতের ময়দানে বলেছিলেন- ”তোমাদের মাঝে যারা উপস্থিত আছ তারা, অনুপস্থিত লোকদের কাছে আমার এ কথা বা বনীগুলোকে পৌঁছে দিবে”। তাই আল্লাহর ও নবী (স:) এর কথাগুলোকে পৌঁছে দেয়ার নিয়তে সবসময় সব জায়গাতে প্রত্যেককে দ্বীনের (ইসলামের) দাওয়াত দেয়া জরুরী।
তালবিয়া
لَبَّيْكَ ٱللَّٰهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ ٱلْحَمْدَ وَٱلنِّعْمَةَ لَكَ وَٱلْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নিমাতা লাকা ওয়ালমুল্ক লা শারি-কা লাক
অর্থ: আমি হাজির হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত! আপনার ডাকে সাড়া দিতে আমি হাজির। আপনার কোন অংশীদার নেই। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা ও সম্পদরাজি আপনার এবং একচ্ছত্র আধিপত্য আপনার।
আপনার কোন অংশীদার নেই।
পবিত্র হজ্জকালীন সময়ে কোরআন-হাদীস সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখে এমন একজন গাইড বা মোয়াল্লেম থাকার মানে হলো আপনার পরিপূর্ণ নির্ভুল একটি হজ্জ সম্পন্ন করা.।
ইহরাম
(যে কোন প্রকারের হজ্জ বা উমরার জন্য ইহরাম বাধা ফরজ)
(মহিলাদের জন্য তাদের স্বাভাবিক পোষাক বা বোরখা-ই ইহরামের বস্ত্র হিসাবে ধরা হয় )
অজু করে ইহ্রামের সেলাই বিহীন কাপড় পরে দুই রাকায়াত নফল (প্রথম রাকায়াতে সূরা কাফিরূন, দ্বিতীয় রাকায়াতে সূরা ইখলাস) পড়ে সালামের পর কা’বা শরীফের দিকে মূখ করে বসে, মাথা খোলা রেখে, নিয়ত-
(আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হাজ্জা ওয়াল উমরাতা ফাইয়াছ ছিরহুমা লি ওয়া তাকাব্বাল মিন্নি )
বাংলায় এভাবে করুন : ”ইয়া আল্লাহ্! আমি উমরাহ/তামাত্তু/ইফরাদ/ক্বিরান হজ্জ পালন করার নিয়ত করছি, আমার জন্য তা সহজ করে দিন এবং কবুল করে নিন।” অত:পর তিনবার তালবিয়াহ পাঠ করি।
ইহরাম বাঁধার পর যে দোয়াটি পড়া সুন্নাত
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা রিদাকা ওয়াল জান্নাতা ওয়া আউজুবিকা মিন গাদাবিকা ওয়ান্নার।
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি মোমার কাছে তোমার সন্তুষ্টি ও জান্নাত আশা করছি এবং তোমার অসন্তুষ্টি ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই।
মসজিদে হারামে প্রবেশের দোয়া
মসজিদে হারামে ’বাবুস সালাম’ দরজা দিয়ে প্রবেশ করা উত্তম। প্রবেশের সময় জুতা ব্যাগে রেখে, ডান পা প্রথমে এগিয়ে দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। প্রবেশ কালে এ দোয়া পড়বে....
"আল্লাহুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রাহমাতিকা ওয়া সাহহিল লানা আবওয়াবা রিজকিকা"
অর্থাৎ হে দয়াময় আল্লাহ! তোমার রহমতের দরজা সমূহ আমার জন্য খুলে দাও এবং রিজিকের দরজা সমূহ আমার জন্য সহজ করে দাও।
ইহরাম বাঁধার পর যে কাজগুলো করা নিষেধ
- অজু-গোসলের পর গামছা বা কাপড় দিয়ে চেহারা না মোছা। শুধুমাত্র হাত দিয়ে মুছতে হবে।
- স্বামী-স্ত্রী দৈহিক সম্পর্ক বা এ জাতীয় কথাবার্তা আলোচনা করা নিষেধ।
- সর্বাবস্থায় মখমন্ডলের সাথে কাপড় লাগিয়ে রাখা নিষেধ। কিন্তু মহিলাদের মুখমন্ডলের কাপড় আলগা রেখে পর্দা করা জরুরী।
- পুরুষদের সেলাইকরা কাপড় বা জুতা-মোজা পরা নিষেধ। কিন্তু মহিলাদের নিষেধ নাই।
- চুল, দাড়ি, নখ ইত্যাদি কাটা সকলের জন্য নিষেধ।
- কোনো পশু-পাখী বা প্রাণী হত্যা বা শিকার করা।
- পিঁপড়া, নিজের মাথার উঁকুন, মশা-মাছি মারা।
- কোনো প্রকার সুগন্ধি দ্রব্য, তৈল ইত্যাদি ব্যবহার করা।
- হারম এলাকার কোনো গাছের ফুল, ফল, পাতা ছেড়া বা পাড়া।
- ঝগড়া-ফাসাদ বা উস্কানি মূলক কথা বা কাজ, যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদি নিষেধ।
বি.দ্র. এমনিতেই ঝগড়া-ফাসাদ করা বা যেকোন অবস্থায় রাগ করা নিষেধ। ইহরাম অবস্থায় আরো কঠোর ভাবে নিষেধ
আছে। প্রত্যেককে এ ব্যপারে সতর্ক থাকা উচিত। অন্যথায় ফিদিয়া ওয়াজিব হবে।
হজ্জের ফরজ সমূহ
হজ্জের ফরজ ৩টি
১. হজ্জের ইহরাম বাধা এবং কোন প্রকারের হজ্জ করবে তার নিয়ত করা।
২. ৯ জিলহজ্জ তারিখে আরাফা ময়দানে অবস্থান এবং
৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা (১০ জিলহজ্জ ভোর থেকে ১২ জিলহজ্জ পর্যন্ত যে কোন দিন)।
এ তিনটি ফরজের কোনো একটি পালন করতে না পারলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে এবং পরবর্তী বছর পূনরায় আদায় করতে হবে।
হজ্জের ওয়াজিব সমূহ
১. মিকাতের পূর্ব হতে ইহরাম বাঁধা;
২. সাফা মারওয়ায় সাঈ করা;
৩. মুজদালিফায় উকুফ করা;
৪. মাথা মুন্ডানো বা চুল ছাটা;
৫. রমি বা শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করা;
৬. বিদেশী হাজীদের তাওয়াফে ছদর বিদায়ী তাওয়াফ করা।
এগুলোর কোনো একটি বাদ গেলে হজ্জ হবে, তবে দম দিতে হবে। দম হলো কাফ্ফারা তথা কুরবানী দেওয়া।
হজ্জের সুন্নাত সমূহ
১. তাওয়াফে কুদুম করা;
২. তাওয়াফে কুদুমের প্রথম ৩ চক্করে রমল করা;
৩. ৮ জিলহজ্জ মিনায় অবস্থান করা;
৪. ৯ জিলহজ্জ আরাফা ময়দানে খুতবা শোনা এবং সূর্যাস্তের পর আরাফাহ ময়দান ত্যাগ করা;
৫. দিবাগত রাতে মুজদালিফায় রাত্রিযাপন করা;
৬. উকুফে আরাফার জন্য জোহরের পূর্বে গোসল করা;
৭. ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্জ দিবাগত রাতে মিনায় অবস্থান করা;
৮. মিনা থেকে মক্কা শরীফ ফেরার সময় ”মুহাছ্ছাব” নামক স্থানে কিছুক্ষণ অবস্থান করা।
কিছু ব্যাপারে জানা থাকলে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়:
মক্কা আল মুর্কারাম থেকে মিনার দূরত্ব ৩ কি: মি: । কিন্তু তাবুর স্থাপনার কারনে দূরত্ব কমবেশী হতে পারে।
৮ জিলহজ্জ মিনায় যোহর, আছর, মাগরিব, ইশা ও ৯ জিলহজ্জ ফজরের সালাত আদায় করে সূর্য উঠার পূর্বেই মিনা ত্যগ করে সরাসরি আরাফাতের ময়দানে দুপুরের আগেই আরাফাতে পৌছাতে হবে। দূরত্ব- কমবেশী ৬ কি: মি:
৯ জিলহজ্জ সূূর্য ঢলার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান ফরজ।
৯ জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দান থেকে সূর্য ডুবার পর রওয়ানা হয়ে রাতেই মুজদালিফায় পৌছাতে হবেই। দূরত্ব: কমবেশী ৩ মাইল ।
মাগরিব এবং এশার সালাত একসাথে মুজদালিফাতে মসজিদে মাশয়ারিল হারামের আশে-পাশে পড়তে হবে এবং সারা রাত দোয়া দরুদ ও তাছবিহ তাহলিল পড়তে হবে আর কাতর কন্ঠে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে হবে।
এখান থেকে রাতেই ৭০টি কংকর সংগ্রহ করতে হবে।
মুজদালিফা সিমানায় রাতে অবস্থান নিশ্চিত হতে হবে এবং ফজর পড়ে সুবহে সাদিক থেকে সর্যদয় পর্যন্ত অবস্থান করা ওয়াজিব। সকালে স্থান ত্যাগ করতে হবে।
১০ জিলহজ্জ মুজদালিফায় ফজরের সালাতের পর দেরী না করে সূর্যোদয়ের সাথেসাথে পূনরায় মিনার ময়দানে তালবিয়া পড়তে পড়তে ফিরে আসা। দূরত্ব : কমবেশী ৩ মাইল ।
পূনরায় মিনায় এসেই তালবিয়া পাঠ শেষে মুজদালিফায় সংগৃহীত ৭০টি কংকর থেকে ৭টি কংকর জামারায় আকাবায় নিক্ষেপ করা।
হজরত ইব্রাহীম (আ:) এর স্মৃতি বিজরিত মিনায় সেই কাংখিত কোরবানী করা।
(তাওয়াফে কুদুমের সাথে সাঈ করা না হয়ে থাকলে মক্কায় এসে সাঈ করুন) এর পর মাথা মুন্ডানো শেষে হালাল হওয়া বা ইহরামের কাপড় খুলে ফেলা।
এক নজরে কংকর মারার নিয়ম:
১০ জিলহজ্জ বড় জামারায় ৭ × ১ = ৭ টি
১১ জিলহজ্জ ৭ × ৩ = ২১ টি
১২ জিলহজ্জ ৭ × ৩ = ২১ টি
১৩ জিলহজ্জ ৭ × ৩ = ২১ টি